বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বাণিজ্যে ধস নেমেছে। চলতি অর্থ বছরের প্রথম মাসেই (আগস্ট) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৭৮ কোটি টাকা। তবে আমদানি বাণিজ্য কমলেও এ পথে রফতানি বাণিজ্যে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
বর্তমানে প্রতি দিন বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হচ্ছে ২শ’ থেকে থেকে ২শ’ ৫০ ট্রাক পণ্য। আর ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে গড়ে ২শ’ ৭০ থেকে ৩ শ‘ ট্রাক বিভিন্ন পণ্য।
গত বছর পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন আমদানি হতো সাড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ ট্রাক পণ্য। বাংলাদেশ থেকে রফতানি হতো মাত্র ১শ’ থেকে ১শ’ ২০ ট্রাক পণ্য।
বেনাপোল আমদানিকারক রফতানিকারক ব্যবসায়ী গোলাম মোরশেদ জানান, ‘‘কয়েক বছর আগেও আমরা শুধুমাত্র আমদানির কথা ভাবতাম। রফতানি হতো মুষ্টিমেয় কয়েকটি পণ্য। ইতিপূর্বে ভারত থেকে আমদানি হতো এমন অনেক পণ্যই এখন বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি কমে গেলেও রফতানি বেড়েছে। দেশের যে সমস্ত পণ্য অযত্নে, অবহেলায় নষ্ট হতো এখন সে সব পণ্য ভারতসহ অন্যান্য দেশে রফতানি হচ্ছে। পণ্য রফতানির সুযোগ হওয়ায় বিদেশে এসব পণ্যের মূল্য ও কদর দিন দিন বেড়েই চলেছে। দেশে অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রফতানি বাণিজ্যে ব্যাপক সম্ভবনা থাকলেও চলমান বেশ কিছু সমস্যার কারণে রফতানি বাণিজ্যে ব্যবসায়ীরা অনিহা প্রকাশ করছে।’’
তিনি আরো জানান, ‘‘ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে রফতানি পণ্য খালাসের জন্য ওয়ার হাউজ ও টার্মিনাল না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে রফতানি বাণিজ্য। বেনাপোল-পেট্রাপোল নোম্যান্সল্যান্ড এলাকায় রফতানি পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। দিনে ৫০ থেকে ৬০টির বেশি ট্রাক সেখানে খালি করা যাচ্ছে না। একটি ট্রাক বেনাপোল বন্দরে পৌছানোর পর ৮ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে পেট্রাপোল বন্দরে পণ্য খালাসের জন্য। পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ট্রাকের প্রতিদিনের জন্য ২ হাজার টাকা ভতর্হকি দিতে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে রফতানি ব্যবসায় লাভ থাকছে না। সময় মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে না পারায় ভারতের আমদানিকারকরা পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে আমাদের বঞ্চিত করছেন।’’
পেট্রাপোল বন্দরে বাংলাদেশি রফতানি পণ্য খালাসের জন্য সেখানে টার্মিনাল নির্মাণের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিলে এ বন্দর দিয়ে রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের সাফল্য নিয়ে আসবে। রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে, ইলিশসহ বিভিন্ন সাদা মাছ, গার্মেন্টস সামগ্রী, চালের পালিশ কুড়া, মেহেগনি ফল, বসুন্ধরা টিস্যু পেপার, ফলের জুস, গলাস, নারিকেলের শলা, মেলামাইন সামগ্রী, পাট, জামদানি শাড়ি, গরুর হাড়, কাঁচা সবজি ইত্যাদি।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল আওয়াল হাওলাদার জানান, ‘‘দিন দিন আমদানি বাণিজ্য কমছে। গত বছরের তুলনায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে রফতানি বাণিজ্য বেড়েছে তিনগুণ। কিন্তু পেট্রাপোল বন্দরে স্থান সঙ্কটের কারণে মারাত্বকভাবে ব্যাহত হচ্ছে রফতানি বাণিজ্য। পেট্রাপোল বন্দরের চলমান সমস্যা নিরসন হলে আরও বৃদ্ধি পাবে রফতানি বাণিজ্য।’’
রফতানি পণ্যের চাপে আমদানি বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। বেনাপোল বন্দর এলাকায় ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত এসমস্ত ট্রাক পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আটকে থাকায় প্রতিদিন মারাত্বক যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ভারতীয় আমদানি পণ্যের ট্রাকগুলো বন্দরে ঢুকতে পারছেনা বলেও জনান তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘‘বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ভারতীয় আমদানি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনেক আগেই বেনাপোল বন্দরকে আধুনিকায়ন করেছেন। বর্তমানে বেনাপোল বন্দরে একটি ভারতীয় ট্রাক টার্মিনাল, ১টি রফতানি টার্মিনাল, ৪২টি ওয়ার হাউজ, ৩টি ওপেন ইয়ার্ড, এছাড়া প্রয়োজনীয় আরও কয়েকটি পণ্য গুদাম ও টার্মিনালের নির্মাণ কাজ চলছে। সে তুলনায় পেট্রাপোল বন্দরে তেমন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।’’
বেনাপোল বন্দর থেকে কলকাতার দুরত্ব মাত্র ৮১ কিলোমিটার। এ কারণে দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা এ পথে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে আগ্রহ দেখান। দেশের শিল্প কারখানার উৎপাদিত কাঁচামালের ৯৫ ভাগই বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি হয়ে থাকে। বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারনে পেট্রাপোল বন্দর কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার অভাবের অভিযোগ উঠেছে।
১ বছর আগে পেট্রাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি টার্মিনাল নির্মাণ কাজে হাত দিয়েছে কিন্তু তার উন্নয়ন কাজ চলছে ধীর গতিতে।
তথ্যমতে,বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তা, কর্মচারীরা অফিস আসেন ৯ টার মধ্যে কিন্তু পেট্রাপোল বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তারা ভারতীয় সময় ১০টার আগে অফিসে আসেন না। ফলে প্রতিদিন ১১টার আগে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য শুরু করতে না পারায় আমদানি বাণিজ্য মারাত্বক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মাসুদ সাদিক জানান, ‘‘আশঙ্কাজনক হারে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি বাণিজ্য কমেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, আমদানি হতো এমন অনেক পণ্য বেনাপোল সীমান্ত পথে চোরাচালান হয়ে চলে আসছে।’’
কালোবাজারে চোরাই পথে আসা এসব পণ্য কম মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ব্যাবসায়ীরা এসব পণ্যের আমদানি বন্ধ করে দিচ্ছে। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার আমদানি থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে মোটরসাইকেলসহ বেশ কিছু যানবাহনের সামগ্রী তৈরি হওয়ায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে এসব পণ্যের আমদানি কমে গেছে।ফলে লক্ষ্যমাত্রা অনুয়ায়ী রাজস্ব আদায় অনিশ্চয়তা দেখা দদিয়েছে।
গত অর্থ বছর ২০১১-১২ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পুরন হয়নি। ঘাটতি ছিল ১শ’ ২৪ কোটি টাকার মত।
চলতি অর্থ বছরে টার্গেট দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬শ’ ২০ কোটি টাকার।
বছরের প্রথম মাস (আগস্টে) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল ২শ’১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
আদায় হয়েছে মাত্র ১শ’৩৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। প্রথম মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি হয়েছে ৭৮ কোটি ১ লাখ টাকা।
বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মাসুদ সাদিক ।
ই-নিউজ/জেএ/ইসি ১৪.৩০ঘ
পাঠকের মন্তব্য