সমাপ্তি ঘটলো ২০১১-এর। কালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া এই বছরটি রাজধানীবাসীর জন্য ছিল প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির একটি বছর। অভিন্ন সিটি কর্পোরেশন দিয়ে ২০১১ সাল শুরু করলেও বছরের শেষ ভাগে এস তা ভেঙ্গে হয়েছে দুই। নতুন বছরে নগরবাসির জন্য দুটি সিটি কর্পোরেশন উপহার দিয়েছে সরকার। বিগত বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনা-দূর্ঘটনা সামজ ও রাজধানীতে ঘটলেও সব চেয়ে আলোচিত ঘটনা হিসেবে দেখা দেয় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ভাগ করা।
২০১১ সালের শেষ দুই মাসে শুধুমাত্র নাগরিক সেবা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হটিয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ করে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মাহাজোট সরকার। বছরের নভেম্বর মাসের ২৯ তারিখে জাতীয় সংসদে সিটি কর্পোরেশন অধ্যাদেশ সংশোধন বিল-২০১১ আনা হয়। আর এই দিন বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে মাত্র চার মিনিটে পাস হয় বহুল আলোচিত এই বিলটি। বিল পাসের পাঁচ দিনের মাথায় চার ডিসেম্বর দুই সিটি কর্পোরেশনের জন্য দুই জন অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত ও জনপ্রতিনিধিদের হটিয়ে এই প্রশাসক নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে পৃথক দুটি রিট করা হলেও প্রশাসক নিয়োগে তা সরকারের জন্য কোন বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনি।
অন্য দিকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত করার প্রতিবাদে সুশিল সামাজের একটি বড় অংশ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও অবশেষে তা সরকারের সিদ্ধান্তের কাছে ঝিমিয়ে পড়ে। সুশিল সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় রাজনৈতিক কৌশল থেকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ভাগ করছে। সুশিল সমাজের এই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আন্দোলনকে সমর্থন করে একদিনের একটি হরতাল পালনের সুযোগ নেয় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। কিন্তু বিএনপির ডাকা সে হরতাল ভোর বেলাতেই ভেস্তে দেয় পুলিশ প্রশাসন। বিএনপির ডাকা হরতাল ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ভাগ করার সরকারের সিদ্ধান্তকে রুখতে তো পারেনি বরং গড়ে ওঠা অন্যান্য আন্দোলনগুলোর জন্যও সর্তক বার্তা হিসেবে কাজ করেছে।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ভাগ করার সিদ্ধান্তকে রুখতে সর্ব প্রথম আন্দোলন গড়ে ওঠে নগর ভবন থেকে। ডিসিসি সর্বদলীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন শুরুতে বেশ আলোচনা সৃষ্টি করলেও শেষের দিকে এসে সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয় পরিষদের লীগ সমর্থিত অংশটি। ফলে সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শক্তি ও সামর্থ্য দুটিই হারিয়ে ফেলে এই পরিষদ। অন্য দিকে অবিভক্ত ডিসিসির কাউন্সিলর ঐক্য পরিষদ অপর একটি আন্দোলন গড়ে তুললেও এখন আর তাদের আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে না। বরং আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকার দলীয় অনেক কাউন্সিলরই এখন ব্যস্ত রয়েছে ডিসিসি ভাগে সরকারকে অভিন্দন জানাতে। আগামী সিটি কর্পোরেশনে সরকারের সমর্থন পেতে এসব সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিন্দন জানিয়ে সাটছেন বিভিন্ন ধরণের পোস্টার ও ব্যানার।
রাজধানীর সাবেক ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুর রহমান অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকলেও এখন তিনি ব্যস্ত রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অভিন্দন জানাতে।
সাবেক ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় গেলে দেখায় ডিসিসিকে ভাগ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানককে অভিন্দন জানিয়ে রং বেরংয়ের পোস্টার ও ব্যানার সেটেছেন সাবেক এই ওয়ার্ড কাউন্সিলর। স্থানীয়রা মনে করছেন আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারের সমর্থন পেতেই এসব করেছেন তিনি।
তবে এব্যাপারে বজলুর রহমান জানান, ‘‘ঢাকাকে ভাগ করার প্রতিবাদে সকল ওয়ার্ড কাউন্সিলর এক হয়ে আন্দোলন করলেও সে আন্দোলন কোন দলের না। তখন সবার সঙ্গে আমিও এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। তবে ডিসিসিকে ভাগ করায় নগরবাসির সেবার মান কমবে না।’’
সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী অ্যাখ্যা দিয়ে সাবেক এই কাউন্সিল বলেন, ‘‘রাজধানীবাসীর সেবার মান উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী ডিসিসি ভাগের এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই।’’
এদিকে ডিসিসিকে দুভাগ করায় সুশিল সমাজ ও নগরবাসীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন অভিন্দন জানানো না হলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক নেতাদের অভিন্দনের ফুলঝুড়িতে ছেয়ে গেছে পুরো রাজধানী। অভিন্দন জানানোর এই দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন মেয়র পদপ্রার্থী স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে এ ব্যাপারে কোন কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে না।
নগরবাসীকে দুটি সিটি কর্পোরেশন উপহার দিলেও সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট নয় রাজধানীবাসী। নির্বাচিত কাউন্সিলরদের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ছোট কাজে ভোগান্তি পোঁহাতে হচ্ছে তাদের। এসব সমস্যা সমাধানের উপায় বলতে পারছেন না ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণ। নাগরিক সনদ, জন্ম-মৃত্যু সনদের মতো মৌলিক সেবাগুলোর জন্য এখনও কাউন্সিলর অফিসে ভিড় করছে রাজধানীবাসী। অনেকেই হাজির হচ্ছেন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের বাড়িতে। এব্যাপারে সাবেক ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর (ভারপ্রাপ্ত ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর) গোলাম রসুল বলেন, ‘‘ ডিসিসি ভাগ হওয়ার আগে আমাকে এক সঙ্গে দুটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাকে নির্ধারিত সময়ের চাইতে দিনে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়েছে এবং বুঝেছি কাজটা কত কঠিন। এখন একটি জোনাল অফিসের একজন নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়ে ১০ টি ওয়ার্ডের কাজ করানো হবে। এটি কোন সহজ কাজ হবে।’’
সাবেক এই কাউন্সিলর বলেন, ‘‘আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কবে নাগাদ হবে তা এখনো জানা যায়নি। আর এই সময়টিতে রাজধানীবাসীকে যে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে তার সমাধানও সরকার করতে পারছেনা।’’
পাঠকের মন্তব্য